রান্নাঘরের গল্প

in BDCommunity19 days ago

প্রতিদিনের রান্নাতেই লুকিয়ে থাকে সংসারের গল্প

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই রান্নার চিন্তাটা মাথায় ঘুরতে থাকে। আজ কী রান্না হবে, কার কী খেতে ভালো লাগে, ঘরে কী কী আছে? এই সব ছোট ছোট হিসাব দিয়েই দিনের শুরু। বাইরে থেকে দেখলে এটা খুব সাধারণ একটা কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু যিনি প্রতিদিন রান্না করেন, তিনি জানেন, এই রান্নার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পুরো সংসারের গল্প।

রান্নাঘরে ঢুকলেই মনে হয়, এটা শুধু একটা ঘর না, এটা সংসারের হৃদয়। চুলার আগুন জ্বলে উঠলে শুধু হাঁড়ি-পাতিল গরম হয় না, সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা আর যত্ন। কোনো দিন মন ভালো থাকে, তখন রান্নায় হাত চলে সহজে। আবার কোনো দিন মন ভারী থাকলে, তবুও রান্না থেমে থাকে না। কারণ সংসার থামে না, দায়িত্ব থামে না।

প্রতিদিনের রান্নার মেনু বদলায়, কিন্তু অনুভূতিটা একই থাকে। একদিন সাধারণ ডাল-ভাত, আরেকদিন একটু বিশেষ কিছু। তবে প্রতিটা রান্নার পেছনে থাকে মানুষের পছন্দ-অপছন্দের হিসাব। কে ঝাল খায়, কে কম মশলা পছন্দ করে, কে কোন তরকারি খেতে চায় না এই সব মনে রেখেই রান্না করতে হয়। এভাবেই রান্নার ভেতর দিয়ে একজন মানুষ ধীরে ধীরে পুরো সংসারটাকে চিনে নেয়।

রান্না করতে করতে অনেক কথা মনে পড়ে। কখনো পুরোনো দিনের কথা, কখনো ভবিষ্যতের চিন্তা। হাত নাড়তে নাড়তে মনটা কোথায় যেন চলে যায়। কোনো কোনো দিন রান্নাঘরটাই হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার জায়গা। সেখানে কেউ প্রশ্ন করে না, কেউ তাড়া দেয় না। শুধু আমি, আমার কাজ আর আমার ভাবনা।

এই প্রতিদিনের রান্নায় লুকিয়ে থাকে ত্যাগের গল্পও। অনেক সময় নিজের পছন্দের খাবারটা না বানিয়ে অন্যদের পছন্দটাই আগে আসে। কখনো নিজের জন্য আলাদা করে কিছু রাখা হয় না। অথচ এই ছোট ছোট ত্যাগগুলো কেউ চোখে দেখে না, কিন্তু সংসারটা এগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

রান্নাঘরের শব্দগুলোও আলাদা রকমের। হাঁড়ির ঢাকনা খোলার শব্দ, খুন্তির ঠকঠক, মশলা ভাজার গন্ধ এই সব মিলেই একটা চেনা পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিবেশেই সংসারের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সব মিশে যায়। অনেক সময় রান্নার মাঝেই কারও সঙ্গে গল্প হয়, কারও সঙ্গে অভিমান, আবার কখনো নীরবতাও থাকে।

প্রতিদিনের রান্না আমাদের জীবনের বাস্তব ছবিটা তুলে ধরে। উৎসবের দিন হলে রান্নাঘর ভরে যায় ব্যস্ততায়, আর সাধারণ দিনে থাকে শান্ত, ধীর একটা ছন্দ। কোনো কোনো দিন রান্না করতে করতে ক্লান্তি আসে, মনে হয় সব দায়িত্ব যেন নিজের ওপরই। তবুও রান্না শেষ হলে, সবাই একসঙ্গে খেতে বসলে সেই ক্লান্তিটা অনেকটাই কমে যায়।

এই রান্নার মধ্য দিয়েই সম্পর্কগুলো আরও গভীর হয়। কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগে, কেউ একটু বেশি নিয়ে খেলে মন ভরে যায়। আবার কেউ না খেলে মন খারাপও হয়। এসব ছোট অনুভূতিই সংসারের গল্পকে বাঁচিয়ে রাখে।

সব মিলিয়ে বলতে গেলে, প্রতিদিনের রান্না শুধু খাবার তৈরি করা নয়। এটা ভালোবাসা প্রকাশের এক নীরব ভাষা। এই রান্নার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সংসারের সুখ, কষ্ট, আশা আর স্বপ্ন। হয়তো সবাই সেটা বুঝে না, কিন্তু যে প্রতিদিন রান্না করে, সে জানে এই সাধারণ কাজটার ভেতরেই তার পুরো সংসারের গল্প লেখা আছে।

IMG_20260116_150419_976.jpg

IMG_20260116_150419_881.jpg